বাংলাদেশিদের জন্য যুক্তরাজ্যে গাড়ি চালানোর নিয়ম
বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে (UK) নতুন আসার পর জীবনযাত্রার অনেক কিছুই বদলে যায়। এর মধ্যে অন্যতম বড় একটি পরিবর্তন হলো রাস্তাঘাট এবং গাড়ি চালানোর নিয়ম। আমাদের দেশে যারা নিয়মিত ড্রাইভ করতেন, তাদের জন্য যুক্তরাজ্যের চমৎকার মসৃণ রাস্তাগুলো প্রথম দেখায় বেশ আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। তবে মনে রাখবেন, ঢাকা বা চট্টগ্রামের ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ি চালানো আর লন্ডনের রাস্তায় ড্রাইভ করার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে।
যুক্তরাজ্যে ট্রাফিক আইন অত্যন্ত কড়া এবং প্রতিটি মোড়ে মোড়ে রয়েছে স্পিড ক্যামেরা ও সিসিটিভি। তাই যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত জরিমানা বা আইনি জটিলতা এড়াতে ইউকে-এর ড্রাইভিং নিয়মগুলো জানা থাকা জরুরি। আজকের ব্লগে আমরা বাংলাদেশী ভাই-বোনদের জন্য যুক্তরাজ্যের ড্রাইভিং সংক্রান্ত যাবতীয় নিয়ম, লাইসেন্স পরিবর্তনের উপায় এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক রুলস নিয়ে সহজ ভাষায় আলোচনা করব।
১. বাংলাদেশী লাইসেন্স নিয়ে যুক্তরাজ্যে গাড়ি চালানো: প্রথম ১২ মাসের নিয়ম
আপনি যদি স্টুডেন্ট, ওয়ার্ক পারমিট কিংবা অন্য কোনো বৈধ ভিসা নিয়ে যুক্তরাজ্যে আসেন, তবে আপনার জন্য একটি চমৎকার সুযোগ রয়েছে। ইউকে সরকারের নিয়ম অনুযায়ী:
১২ মাসের গোল্ডেন রুল: যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর প্রথম ১২ মাস (১ বছর) আপনি আপনার বৈধ বাংলাদেশী ইন্টারন্যাশনাল ড্রাইভিং পারমিট (IDP) অথবা মূল বাংলাদেশী ড্রাইভিং লাইসেন্স (যদি সেটি ইংরেজিতে পরিষ্কারভাবে পড়া যায়) দিয়ে যেকোনো ছোট গাড়ি (কার বা মোটরসাইকেল) চালাতে পারবেন।
তবে এই সুবিধার কিছু শর্ত আছে:
- আপনার বাংলাদেশী লাইসেন্সটি অবশ্যই সম্পূর্ণ বৈধ এবং আপ-টু-ডেট হতে হবে।
- যুক্তরাজ্যে প্রবেশের প্রথম দিন থেকে এই ১ বছরের মেয়াদ গণনা শুরু হয়।
- গাড়ি চালানোর সময় অবশ্যই লাইসেন্সের মূল কপি এবং আপনার পাসপোর্ট সাথে রাখতে হবে।
২. ১২ মাস কেটে গেলে করণীয়: ফুল ইউকে লাইসেন্স পাওয়ার উপায়
বাংলাদেশ যুক্তরাজ্যের "Designated Countries" (যেমন- অস্ট্রেলিয়া, কানাডা বা দক্ষিণ আফ্রিকা) তালিকার অন্তর্ভুক্ত নয়। এর অর্থ হলো, ১ বছর পার হয়ে গেলে আপনি সরাসরি আপনার বাংলাদেশী লাইসেন্সটি জমা দিয়ে যুক্তরাজ্যের লাইসেন্স এক্সচেঞ্জ বা পরিবর্তন করতে পারবেন না।
১ বছর পর যুক্তরাজ্যে বৈধভাবে গাড়ি চালাতে হলে আপনাকে নতুন করে ব্রিটিশ ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হবে এবং পরীক্ষায় পাস করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি নিচে পর্যায়ক্রমে আলোচনা করা হলো:
A. প্রোভিশনাল লাইসেন্সের আবেদন (Provisional Licence):
সময়: ১-৩ সপ্তাহ
১ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আপনাকে DVLA (Driver and Vehicle Licensing Agency)-এর ওয়েবসাইটে গিয়ে একটি 'Provisional Licence'-এর জন্য আবেদন করতে হবে। এর জন্য একটি নির্দিষ্ট ফি দিতে হয় এবং আপনার রেসিডেন্সি প্রমাণ করতে হয় (যুক্তরাজ্যে অন্তত ১৮৫ দিন বসবাসের প্রমাণ)।
B. এল লার্নার (L) প্লেট ব্যবহার করা:
বাধ্যতামূলক নিয়ম
প্রোভিশনাল লাইসেন্স হাতে পাওয়ার পর আপনি যখনই গাড়ি ড্রাইভ করবেন, গাড়ির সামনে এবং পেছনে অবশ্যই লাল রঙের 'L' (Learner) প্লেট লাগিয়ে রাখতে হবে। এছাড়া আপনার পাশে এমন একজন অভিজ্ঞ চালক থাকতে হবে যার বয়স ২১ বছরের বেশি এবং যার অন্তত ৩ বছরের ফুল ইউকে লাইসেন্স রয়েছে।
C. থিওরি টেস্টে পাস করা (Theory Test):
ফি এবং প্রস্তুতি
আপনাকে যুক্তরাজ্যের 'Highway Code' বা ট্রাফিক নিয়মের ওপর একটি কম্পিউটার ভিত্তিক থিওরি টেস্ট দিতে হবে। এতে বহুনির্বাচনী প্রশ্ন এবং হ্যাজার্ড পারসেপশন (ঝুঁকি শনাক্তকরণ) টেস্ট অন্তর্ভুক্ত থাকে। এই পরীক্ষায় পাস করা ছাড়া আপনি প্র্যাক্টিক্যাল টেস্ট বুক করতে পারবেন না।
D. প্র্যাক্টিক্যাল ড্রাইভিং টেস্ট (Practical Driving Test):
চূড়ান্ত ধাপ
থিওরি পাস করার পর আপনাকে একজন অফিসিয়াল পরীক্ষকের সাথে গাড়িতে বসে প্র্যাক্টিক্যাল টেস্ট দিতে হবে। পরীক্ষক আপনার ড্রাইভ করার দক্ষতা, রাউন্ডঅ্যাবাউটের ব্যবহার এবং রিভার্স পার্কিং নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। এই টেস্টে পাস করলেই কেবল আপনি "Full UK Driving Licence" পাবেন।
৩. যুক্তরাজ্যের ট্রাফিক নিয়মের কিছু মৌলিক পার্থক্য
বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে কিছু নিয়মে বিশাল অমিল রয়েছে। যুক্তরাজ্যে গাড়ি চালানোর সময় নিচের বিষয়গুলো অবশ্যই মাথায় রাখবেন:
- রাস্তার বাম পাশ দিয়ে চালানো: বাংলাদেশের মতোই যুক্তরাজ্যেও রাস্তার বাম পাশ দিয়ে গাড়ি চালাতে হয় এবং গাড়ির স্টিয়ারিং ডানদিকে থাকে। তাই ডান-বাম নিয়ে সমস্যা না হলেও রাস্তার লেনের শৃঙ্খলা এখানে অনেক বেশি কঠোর।
- রাউন্ডঅ্যাবাউট (Roundabout) কালচার: যুক্তরাজ্যের প্রায় প্রতিটি বড় মোড়েই রাউন্ডঅ্যাবাউট বা গোলচত্বর থাকে। এখানকার মূল নিয়ম হলো— সর্বদা আপনার ডান দিক থেকে আসা গাড়িকে অগ্রাধিকার (Give Way) দিতে হবে। ডানদিকের রাস্তা পুরোপুরি ফাঁকা না হওয়া পর্যন্ত আপনি রাউন্ডঅ্যাবাউটে প্রবেশ করতে পারবেন না।
- জেব্রা ক্রসিং ও পথচারী: ইউকে-তে পথচারীদের সর্বোচ্চ সম্মান ও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কোনো পথচারী যদি জেব্রা ক্রসিংয়ের কাছে দাঁড়ায়, তবে আপনাকে অবশ্যই গাড়ি থামিয়ে তাকে রাস্তা পার হওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
- হর্নের ব্যবহার: বাংলাদেশে আমরা কথায় কথায় হর্ন দিই, কিন্তু যুক্তরাজ্যে অকারণে হর্ন দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেবল কোনো জরুরি বিপদ সংকেত বা অন্য কোনো চালককে সতর্ক করার জন্য মৃদু হর্ন ব্যবহার করা যায়। রাত ১১টা ৩০ মিনিট থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত আবাসিক এলাকায় হর্ন বাজানো আইনত দণ্ডনীয়।
৪. গাড়ি রাস্তায় নামানোর আগে ৩টি আইনি বাধ্যবাধকতা
যুক্তরাজ্যে শুধু গাড়ি এবং লাইসেন্স থাকলেই ড্রাইভ করা যায় না। আপনার নিজের গাড়ি হোক কিংবা পরিচিত কারও, রাস্তাঘাটে গাড়ি নামানোর আগে ৩টি জিনিস শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে:
|
আইনি আবশ্যকতা |
বিবরণ |
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ? |
|
১. কার ইন্স্যুরেন্স (Car Insurance) |
যুক্তরাজ্যে ইন্স্যুরেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো একটি গুরুতর অপরাধ। কমপক্ষে 'Third-Party' ইন্স্যুরেন্স থাকতেই হবে। |
ইন্স্যুরেন্স ছাড়া ড্রাইভ করলে বড় অংকের জরিমানা এবং লাইসেন্সে পেনাল্টি পয়েন্ট যোগ হতে পারে। |
|
২. রোড ট্যাক্স (Road Tax / Vehicle Excise Duty) |
প্রতিটি গাড়ির জন্য সরকারের নির্দিষ্ট ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয়, যা অনলাইনেই চেক করা যায়। |
ট্যাক্স না দিলে আপনার গাড়িটি DVLA জব্দ বা ক্ল্যাম্প করে দিতে পারে। |
|
৩. এমওটি টেস্ট (MOT Certificate) |
৩ বছরের বেশি পুরোনো প্রতিটি গাড়ির রোড-ফিটনেস বা পরিবেশগত যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রতি বছর এই টেস্ট করাতে হয়। |
MOT সার্টিফিকেট ছাড়া গাড়ি চালানো অবৈধ এবং এটি না থাকলে আপনার ইন্স্যুরেন্স বাতিল হয়ে যাবে। |
যুক্তরাজ্যের সুন্দর ট্রাফিক ব্যবস্থার মূল সৌন্দর্য হলো সবাই নিয়ম মেনে চলে। আপনি যদি শান্ত মাথায় স্পিড লিমিট বজায় রেখে এবং সাইনপোস্টগুলো খেয়াল করে ড্রাইভ করেন, তবে ইউকে-র রাস্তায় গাড়ি চালানো আপনার জন্য অত্যন্ত আনন্দদায়ক একটি অভিজ্ঞতা হবে। প্রথম প্রথম রাউন্ডঅ্যাবাউট বা সরু রাস্তাগুলোতে একটু ভয় লাগতে পারে, তবে কয়েকদিনের অনুশীলনেই এটি সহজ হয়ে যায়। আপনার ইউকে ড্রাইভিং যাত্রা নিরাপদ ও সুন্দর হোক!

