সড়কে গাড়ি বা মোটরসাইকেল নিয়ে বের হলে ট্রাফিক আইন জানা এবং তা মেনে চলা আমাদের প্রত্যেকের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। বাংলাদেশে সড়ক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সরকার সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর করেছে। এই আইনে আগের তুলনায় জরিমানা ও শাস্তির পরিমাণ অনেকটাই বাড়ানো হয়েছে, যাতে চালকদের মধ্যে আইন মানার প্রবণতা তৈরি হয়।
অনেকেই সঠিক তথ্যের অভাব কিংবা অসচেতনতার কারণে রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশের মামলার (Case) মুখে পড়েন। আজকের ব্লগে আমরা বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (BRTA) এবং ট্রাফিক পুলিশের অফিসিয়াল তথ্য ও নির্দেশনাবলী অনুযায়ী বিভিন্ন ট্রাফিক অপরাধের জরিমানার পরিমাণ, আইনি ধারা এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে জরিমানা পরিশোধের নিয়মগুলো সহজ ভাষায় আলোচনা করব।
সড়ক শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত ট্রাফিক পুলিশ. Source: Paribahan Hishab
ট্রাফিক আইন ও জরিমানার আপডেট তালিকা
নিচে বহুল প্রচলিত ট্রাফিক অপরাধ এবং সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সর্বোচ্চ জরিমানা ও কারাদণ্ডের একটি তুলনামূলক তালিকা দেওয়া হলো:
|
ট্রাফিক অপরাধের ধরন |
সর্বোচ্চ জরিমানা (টাকা) |
সর্বোচ্চ কারাদণ্ড |
সংশ্লিষ্ট আইনি ধারা |
|
ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো |
২৫,০০০ টাকা |
৬ মাস |
ধারা ৪ ও ৬৬ |
|
রেজিস্ট্রেশনবিহীন গাড়ি চালানো |
৫০,০০০ টাকা |
৬ মাস |
ধারা ১৬ ও ৭২ |
|
ফিটনেসবিহীন বা মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি চালানো |
২৫,০০০ টাকা |
৬ মাস |
ধারা ২৫ ও ৭৫ |
|
অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো (Speeding) |
১০,০০০ টাকা |
৩ মাস |
ধারা ৪৪ ও ৮৭ |
|
ট্রাফিক সংকেত বা সিগন্যাল অমান্য করা |
১০,০০০ টাকা |
৩ মাস |
ধারা ৪২ ও ৮৭ |
|
উল্টো পথে গাড়ি চালানো |
১০,০০০ টাকা |
৩ মাস |
ধারা ৮৭ |
|
হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো (চালক বা আরোহী) |
১০,০০০ টাকা |
৩ মাস |
ধারা ৮৯ |
|
সিটবেল্ট না বাঁধা বা চলন্ত অবস্থায় ফোনে কথা বলা |
৫,০০০ টাকা |
১ মাস (ফোনে কথা বলার জন্য) |
ধারা ৪৯ |
|
অবৈধ পার্কিং বা নো-পার্কিং জোনে গাড়ি রাখা |
৫,০০০ টাকা |
- |
ধারা ৪৭ |
|
ভুয়া বা জাল ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যবহার |
১,০০,০০০ থেকে ৫,০০,০০০ টাকা |
৬ মাস থেকে ২ বছর |
ধারা ৫ ও ৬৭ |
|
অনুমোদনহীন বডি মডিফিকেশন বা হর্ন ব্যবহার |
৩,০০,০০০ টাকা |
৩ বছর |
ধারা ৪০ ও ৮৪ |
সতর্কতা: আইন অনুযায়ী, একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার করলে শাস্তির পরিমাণ এবং জরিমানার অঙ্ক দ্বিগুণ হয়ে যাবে।
প্রধান ট্রাফিক অপরাধগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. ড্রাইভিং লাইসেন্স সংক্রান্ত নিয়ম (ধারা ৪ ও ৬৬)
বৈধ ও হালনাগাদ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া কোনো পাবলিক প্লেসে বা রাস্তায় মোটরযান চালানো সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ। আগে এই অপরাধের জরিমানা মাত্র ৫০০ টাকা থাকলেও বর্তমান আইনে তা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ২৫,০০০ টাকা করা হয়েছে। তাই রাস্তায় বের হওয়ার আগে সর্বদা আপনার লাইসেন্সের মেয়াদ চেক করে নিন।
২. রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সার্টিফিকেট (ধারা ১৬, ২৫, ৭২ ও ৭৫)
আপনার মোটরযানের বিআরটিএ রেজিস্ট্রেশন এবং ফিটনেস সার্টিফিকেট সবসময় আপ-টু-ডেট থাকতে হবে। ফিটনেসবিহীন বা কালো ধোঁয়া ছড়ানো যানবাহন পরিবেশ ও সড়ক উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। রেজিস্ট্রেশন ছাড়া গাড়ি চালালে ৫০,০০০ টাকা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ বা ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালালে ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
৩. মোটরসাইকেল চালকদের জন্য বিশেষ নিয়ম (ধারা ৮৯)
বাইকারদের জন্য হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক। শুধু চালক নন, মোটরসাইকেলের পেছনে বসা সহযাত্রী বা আরোহীর মাথায়ও সার্টিফাইড হেলমেট থাকতে হবে। হেলমেট না থাকলে কিংবা মোটরসাইকেলে তিনজন আরোহী বহন করলে (ওভারলোডিং) সর্বোচ্চ ১০,০০০ টাকা জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে।
চালকের 'পয়েন্ট' সিস্টেম (Demerit Point System)
নতুন নিয়মের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো ড্রাইভিং লাইসেন্সের ১২ পয়েন্টের নিয়ম। এটি চালকদের ট্রাফিক আইন মানতে বাধ্য করার একটি আধুনিক পদ্ধতি।
- প্রতিটি ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিপরীতে শুরুতে ১২ পয়েন্ট বরাদ্দ থাকে।
- আপনি যখনই কোনো নির্দিষ্ট ট্রাফিক আইন ভাঙবেন (যেমন: অতিরিক্ত গতিতে চলা, সিগন্যাল অমান্য করা, উল্টো পথে যাওয়া), তখন আপনার লাইসেন্স থেকে ১ বা ২ পয়েন্ট কেটে নেওয়া হবে।
- এভাবে অপরাধ করতে করতে যদি ১২ পয়েন্টেরই কর্তন ঘটে, তবে সংশ্লিষ্ট চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্সটি সম্পূর্ণ বাতিল বা স্থগিত করা হয়।
অনলাইনে ট্রাফিক জরিমানা চেক ও পরিশোধের সহজ উপায়
ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থার কল্যাণে এখন আর জরিমানার টাকা জমা দিতে বা কাগজের স্লিপ নিয়ে ট্রাফিক অফিসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না। নিচের প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করে ঘরে বসেই জরিমানা পরিশোধ করা সম্ভব:
ই-প্রসিকিউশন মেসেজ চেক করুন:
ধাপ ১.
গাড়ি বা মোটরবাইকে কোনো মামলা হলে আপনার নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে তাৎক্ষণিকভাবে একটি ট্রাফিক মামলার এসএমএস (SMS) আসবে। সেখানে একটি নির্দিষ্ট 'মামলা নম্বর' বা 'ট্র্যাক আইডি' দেওয়া থাকবে।
পেমেন্ট পোর্টাল বা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপে যান:
ধাপ 2
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (DMP) পেমেন্ট পোর্টাল অথবা আপনার ফোনে থাকা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপের (যেমন: বিকাশ, রকেট) 'বিল পে' (Bill Pay) অপশনে যান এবং 'Traffic Fine' বা 'Government Fee' সিলেক্ট করুন।
মামলা নম্বর ইনপুট দিন:
ধাপ 3
মোবাইল স্ক্রিনে আসা নির্দিষ্ট বক্সে আপনার ই-প্রসিকিউশন বা মামলা নম্বরটি নির্ভুলভাবে লিখুন। এরপর আপনার গাড়ির নম্বর ও জরিমানার টাকার পরিমাণ স্ক্রিনে ভেসে উঠবে।
পেমেন্ট সম্পন্ন করে ডিজিটাল রশিদ সংগ্রহ করুন:
ধাপ 4
টাকার পরিমাণ নিশ্চিত হয়ে আপনার অ্যাকাউন্টের পিন নম্বর দিয়ে পেমেন্ট সফলভাবে সম্পন্ন করুন। এরপর প্রাপ্ত ডিজিটাল পেমেন্ট রশিদটি ডাউনলোড করে ফোনে সংরক্ষণ করুন। পরবর্তীতে ট্রাফিক পুলিশ চাইলে এটি প্রমাণ হিসেবে দেখাতে পারবেন।
জরিমানার ভয় পাওয়ার চেয়ে নিজের এবং পরিবারের সুরক্ষার স্বার্থে ট্রাফিক আইন মেনে চলা বেশি জরুরি। সামান্য অসচেতনতা কিংবা তাড়াহুড়ো বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই সর্বদা ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলুন, সিটবেল্ট ও হেলমেট ব্যবহার করুন এবং একটি সুশৃঙ্খল সড়ক গড়তে অবদান রাখুন।
ট্রাফিক আইন, লাইসেন্স এবং ড্রাইভিং সংক্রান্ত আরও তথ্য জানতে নিচের বিষয়গুলো দেখতে পারেন:

